বগুড়া: রাত তখন প্রায় ১১টা। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে একটি দোকানের বারান্দায় ছোট্ট একটি মেয়ে বসে আছে। হাতে একটি বাজারের ব্যাগ, গায়ে পরিষ্কার পোশাক। কিন্তু চোখেমুখে গভীর অভিমান আর একরাশ ক্লান্তি। যেন অপেক্ষা করছে—কেউ এসে বলবে, “চলো, বাড়ি যাই।” কিন্তু সেই ডাকার মানুষটি আর কেউ নয়—তার হারিয়ে যাওয়া পরিবার।
বগুড়ার শেরপুরে বুধবার রাতে এমন হৃদয়ছোঁয়া ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১১ বছর বয়সী জান্নাতি খাতুন। মা-বাবা বেঁচে থাকলেও বিচ্ছেদের কারণে তাদের কেউই আজ তার আশ্রয় নয়। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে বড় হওয়া শিশুটি অবহেলা আর মানসিক কষ্ট সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শেরপুর পৌর শহরের বাসিন্দা সবুজ ইসলাম রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে দোকানের বারান্দায় একা বসে থাকা শিশুটিকে দেখতে পান। সন্দেহ হলে তিনি তার সঙ্গে কথা বলেন। তখনই জান্নাতির জীবনের করুণ গল্প উঠে আসে।
খুব ছোট বয়সেই বাবা-মায়ের সংসার ভেঙে যায় জান্নাতির। পরে বাবা ঢাকায় নতুন সংসার শুরু করেন, আর মা অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। এরপর কখনো খালার বাড়ি, কখনো মামার বাড়িতে ঠাঁই হলেও কোথাও স্থায়ী আশ্রয় হয়নি তার। বিভিন্ন সময় অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথাও জানায় সে। সর্বশেষ খালার বাড়ি ছেড়ে একরকম অভিমান নিয়েই বেরিয়ে পড়ে শিশুটি।
খবর পেয়ে স্থানীয় আবু জাফর, মাহমুদুল হাসান মুজাহিদ, তনু ও সাব্বিরসহ কয়েকজন তরুণ ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তারা প্রথমে শিশুটিকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য থানায় নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
উদ্ধারকারী তরুণ আবু জাফর জানান, প্রথমে ফোনে থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে অনীহা দেখা যায়। পরে তারা শিশুটিকে নিয়ে শেরপুর থানায় যান। তবে সেখানেও তাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিতে বলা হয়।
গভীর রাত পর্যন্ত শিশুটিকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যান ওই তরুণেরা। একপর্যায়ে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের।
অবশেষে হাল না ছেড়ে শিশুটির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হয় স্বজন খোঁজার চেষ্টা। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর রাত গভীরে শাহবন্দেগী ইউনিয়নের দহপাড়া গ্রামে তার মামার বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে মামা ও নানার সঙ্গে কথা বলে জান্নাতির থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন তারা।
জান্নাতির মামা রফিকুল ইসলাম জানান, মা-বাবার বিচ্ছেদের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। এরপর থেকেই সে বিভিন্ন আত্মীয়ের কাছে থেকেছে। বুধবার গভীর রাতে কয়েকজন তরুণ তাকে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। বর্তমানে শিশুটি তাদের কাছেই রয়েছে।
এদিকে কয়েকজন তরুণের মানবিক ভূমিকা স্থানীয়দের প্রশংসা কুড়ালেও পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন, বিপদে মানুষের প্রথম ভরসার জায়গা যদি সহানুভূতির বদলে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি দেখায়, তবে সাধারণ মানুষ নিরুৎসাহিত হবে।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে থানায় কাউকে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে উদ্ধারকারী তরুণদের দাবি, জান্নাতি সুস্থ-স্বাভাবিক ছিল এবং আত্মীয়দের ঠিকানাও জানাতে পেরেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, মানবিক বিবেচনায় শিশুটিকে থানার হেফাজতে রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, সেটি করা হয়নি, যা দুঃখজনক।
একটি রাত, একটি দোকানের বারান্দা আর এক শিশুর নীরব অপেক্ষা—জান্নাতির গল্প যেন সমাজকে আবারও মনে করিয়ে দিল, রক্তের সম্পর্ক সব সময় আশ্রয় দেয় না; কখনো কখনো অচেনা মানুষই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আপন।
Reporter Name 


















