০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিবগঞ্জে প্রতিবন্ধী কৃষকের পুড়ল স্বপ্নের পাটক্ষেত, জমি দখলে বিষ প্রয়োগ!

  • Reporter Name
  • ০২:২৫:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
  • ৫৯
গোলাম রব্বানী শিপন, শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ মাটির বুকে সোনা ফলার স্বপ্ন বুনেছিলেন (৬৫) বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যাকে থামাতে পারেনি, তাকে থামিয়ে দিল মানুষের লোভ আর নিষ্ঠুরতা। পৈতৃক ভিটেমাটির ১৪ শতক জমিতে বুকভরা আশা নিয়ে সোনালী ফসল পাটের চাষ করেছিলেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নের বাউলাপাড়া গ্রামের মৃত শাবান উদ্দিনের পুত্র শাহজাহান আলী সরকার। কিন্তু সেই সবুজ স্বপ্নের বুকে রাতের আঁধারে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে ঢেলে দেওয়া হলো ঘাস মারা বিষ। জমি জবরদখল করতে প্রতিপক্ষের দেওয়া ঘাস মারা বিষাক্ত স্প্রেতে মরে ছারখার হয়ে গেছে তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের ফসল।
এবিষয়ে শিবগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
​অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অসহায় ও প্রতিবন্ধী কৃষক শাহজাহান আলী সরকারের পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত করতকোলা মৌজার ১৪ শতক জমির ওপর চোখ পড়ে একই গ্রামের একদল প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীর। গত ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে আইনের তোয়াক্কা না করে জমিতে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করে একই গ্রামের মৃত ছালেকের ছেলে শাহাদত হোসেন শাহীন (৪৫), মৃত জসিম উদ্দিনের ছেলে সান্না মিয়া (৩৬), মৃত হাতেম ফকিরের ছেলে খলু (৬০), আল আমিন (২৪) এবং আহসান হাবীব (২০)।
​তারা জমিটি জবরদখল করার  উদ্দেশ্যে জঘন্য এক পথ বেছে নেয়। শাহজাহান আলীর পরম যত্নে বেড়ে ওঠা পাটক্ষেতে তারা নির্বিচারে ঘাস মারা রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে। মুহূর্তেই সবুজ পাটগাছগুলো বিষের তীব্রতায় বিবর্ণ হয়ে পড়তে থাকে।
​ফসলের এই নির্মম পরিণতি দেখে বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে মাঠে ছুটে যান বৃদ্ধ শাহজাহান আলী। কিন্তু সেখানে ন্যুনতম সহানুভূতি পাওয়ার বদলে তাকে পড়তে হয় চরম লাঞ্ছনার মুখে। অভিযুক্তরা তাকে দেখা মাত্রই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবন্ধী এই বৃদ্ধের ওপর মারমুখী আচরণ করে এবং তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে মাঠ থেকে তাড়িয়ে দেয়।
​ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী সরকার জানান, তার প্রায় ২০ হাজার টাকার সমপরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও তার বুকে বড় হয়ে বাজছে নিজের কষ্টের ফসলের এই নির্মম মৃত্যু। তিনি বলেন,
​”আমি প্রতিবন্ধী মানুষ, অনেক কষ্ট করে পৈতৃক জমিতে পাট বুনেছিলাম। ওরা আমার ফসল পুড়িয়ে দিল না, আমার পেটে লাথি মারল। আমি এর বিচার চাই।”
— কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী আরও বলেন, ইতিপূর্বেও আমার ওপর হামলা করেছিল ​আদালতে তার মামলাও রয়েছে।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতিপূর্বেও এই চক্রটি শাহজাহান আলীর জমি দখল করতে তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে গুরুতর আহত করেছিল। সেই ঘটনায় নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ কৃষক বগুড়ার বিজ্ঞ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু আদালতের আইন ও বিচারাধীন বিষয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসামিরা এই জঘন্য তাণ্ডব চালাল।
​এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাউলাপাড়া গ্রামে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। গ্রামের সাধারণ মানুষ এই অসহায় প্রতিবন্ধী কৃষকের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
​পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা ও নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী অসহায় প্রতিবন্ধী কৃষক শাহজাহান আলী সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং শিবগঞ্জ থানা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। জড়িতদের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন তিনি।
​এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিনুজ্জামান শাহিন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
​”কৃষকরা আমাদের দেশের প্রাণ, তাদের ক্ষতি মানে দেশের ক্ষতি। একজন প্রতিবন্ধী কৃষকের ফসলের ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
 এলাকার সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া—ন্যায়বিচার যেন শুধু কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন বাস্তবে রূপ পায়।
Tag :

Write Your Comment

About Author Information

জনপ্রিয়

বগুড়ায় প্রেস কাউন্সিলের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

শিবগঞ্জে প্রতিবন্ধী কৃষকের পুড়ল স্বপ্নের পাটক্ষেত, জমি দখলে বিষ প্রয়োগ!

০২:২৫:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
গোলাম রব্বানী শিপন, শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ মাটির বুকে সোনা ফলার স্বপ্ন বুনেছিলেন (৬৫) বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যাকে থামাতে পারেনি, তাকে থামিয়ে দিল মানুষের লোভ আর নিষ্ঠুরতা। পৈতৃক ভিটেমাটির ১৪ শতক জমিতে বুকভরা আশা নিয়ে সোনালী ফসল পাটের চাষ করেছিলেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়নের বাউলাপাড়া গ্রামের মৃত শাবান উদ্দিনের পুত্র শাহজাহান আলী সরকার। কিন্তু সেই সবুজ স্বপ্নের বুকে রাতের আঁধারে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে ঢেলে দেওয়া হলো ঘাস মারা বিষ। জমি জবরদখল করতে প্রতিপক্ষের দেওয়া ঘাস মারা বিষাক্ত স্প্রেতে মরে ছারখার হয়ে গেছে তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের ফসল।
এবিষয়ে শিবগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
​অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অসহায় ও প্রতিবন্ধী কৃষক শাহজাহান আলী সরকারের পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত করতকোলা মৌজার ১৪ শতক জমির ওপর চোখ পড়ে একই গ্রামের একদল প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীর। গত ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে আইনের তোয়াক্কা না করে জমিতে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করে একই গ্রামের মৃত ছালেকের ছেলে শাহাদত হোসেন শাহীন (৪৫), মৃত জসিম উদ্দিনের ছেলে সান্না মিয়া (৩৬), মৃত হাতেম ফকিরের ছেলে খলু (৬০), আল আমিন (২৪) এবং আহসান হাবীব (২০)।
​তারা জমিটি জবরদখল করার  উদ্দেশ্যে জঘন্য এক পথ বেছে নেয়। শাহজাহান আলীর পরম যত্নে বেড়ে ওঠা পাটক্ষেতে তারা নির্বিচারে ঘাস মারা রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে। মুহূর্তেই সবুজ পাটগাছগুলো বিষের তীব্রতায় বিবর্ণ হয়ে পড়তে থাকে।
​ফসলের এই নির্মম পরিণতি দেখে বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে মাঠে ছুটে যান বৃদ্ধ শাহজাহান আলী। কিন্তু সেখানে ন্যুনতম সহানুভূতি পাওয়ার বদলে তাকে পড়তে হয় চরম লাঞ্ছনার মুখে। অভিযুক্তরা তাকে দেখা মাত্রই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবন্ধী এই বৃদ্ধের ওপর মারমুখী আচরণ করে এবং তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে মাঠ থেকে তাড়িয়ে দেয়।
​ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী সরকার জানান, তার প্রায় ২০ হাজার টাকার সমপরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও তার বুকে বড় হয়ে বাজছে নিজের কষ্টের ফসলের এই নির্মম মৃত্যু। তিনি বলেন,
​”আমি প্রতিবন্ধী মানুষ, অনেক কষ্ট করে পৈতৃক জমিতে পাট বুনেছিলাম। ওরা আমার ফসল পুড়িয়ে দিল না, আমার পেটে লাথি মারল। আমি এর বিচার চাই।”
— কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী আরও বলেন, ইতিপূর্বেও আমার ওপর হামলা করেছিল ​আদালতে তার মামলাও রয়েছে।
​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতিপূর্বেও এই চক্রটি শাহজাহান আলীর জমি দখল করতে তাকে নির্মমভাবে মারপিট করে গুরুতর আহত করেছিল। সেই ঘটনায় নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ কৃষক বগুড়ার বিজ্ঞ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু আদালতের আইন ও বিচারাধীন বিষয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসামিরা এই জঘন্য তাণ্ডব চালাল।
​এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাউলাপাড়া গ্রামে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। গ্রামের সাধারণ মানুষ এই অসহায় প্রতিবন্ধী কৃষকের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
​পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা ও নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী অসহায় প্রতিবন্ধী কৃষক শাহজাহান আলী সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং শিবগঞ্জ থানা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। জড়িতদের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন তিনি।
​এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিনুজ্জামান শাহিন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
​”কৃষকরা আমাদের দেশের প্রাণ, তাদের ক্ষতি মানে দেশের ক্ষতি। একজন প্রতিবন্ধী কৃষকের ফসলের ক্ষতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
 এলাকার সাধারণ মানুষের এখন একটাই চাওয়া—ন্যায়বিচার যেন শুধু কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন বাস্তবে রূপ পায়।