০৬:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বগুড়ায় প্রতিদিন বিয়ে রেজিষ্ট্রির অর্ধেকের বেশি হচ্ছে তালাক!

  • Reporter Name
  • ০৩:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫৪

সোনাতলা সংবাদ ডেস্ক: মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সেবা (ছদ্মনাম)-এর। কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই সংসারজীবনে নেমে আসে নির্যাতনের অন্ধকার। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। এরই মধ্যে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। একসময় জীবন বাঁচাতে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে নানীর কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হন সেবা। দীর্ঘ কষ্টের পর পরিবারের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথই বেছে নিতে হয় তাকে।

সেবার মতো একই পরিণতি হয়েছে শাজাহানপুর উপজেলার রাবেয়া (ছদ্মনাম)-এর। কিশোরী বয়সেই একই গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু সংসার শুরুর পর থেকেই স্বামীর শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গত ২৪ জুন মাত্র ৮০ হাজার টাকা খোরপোশের বিনিময়ে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে।

একইভাবে গাবতলী উপজেলার টুম্পা (ছদ্মনাম)-এর সংসারও টেকেনি। বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া এই তরুণীকে গত ৩ জুলাই মাত্র ৫০ হাজার টাকা খোরপোশ দিয়ে তালাক দেন তার স্বামী। এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

বাল্যবিয়ে থেকে শুরু, শেষ হয় তালাকে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইনের বিধিনিষেধ এড়িয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে কিংবা কোনো নিবন্ধন ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার অভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্রুত মতবিরোধ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বামীর মাদকাসক্তি, জুয়া, পরকীয়া এবং যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের মতো নানা সামাজিক সমস্যা। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংসার ভেঙে যাচ্ছে।

শাজাহানপুর উপজেলায় বাল্যবিয়ে ও পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, উপজেলার একটি ইউনিয়নেই এক মাসে ৩১টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। তার মতে, অপরিণত বয়সে বিয়ে এবং রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ের কারণেই বিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তালাকের সময় নারীরা ন্যায্য খোরপোশও পান না। আবার কিছু তালাক মৌখিকভাবেও সম্পন্ন হচ্ছে।

গ্রামে বেশি ভাঙছে সংসার

নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারদী শবনম মিথুন বলেন, অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে দাম্পত্য জীবনে দ্রুত সংকট তৈরি হয়। গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা শহরের তুলনায় বেশি। অনেকেই আইনের চোখ ফাঁকি দিতে ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহার করে বা নিবন্ধন ছাড়া বিয়ে করেন। পাশাপাশি মাদক, যৌতুক, পরকীয়া এবং পারিবারিক সহিংসতা তালাকের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শহরের নারীরা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত, সচেতন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন। বর্তমানে তালাকের আবেদনগুলোর বড় অংশই আসছে নারীদের পক্ষ থেকে।

প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে তালাকের আবেদন

বগুড়া জেলা কাজী সমিতির একাধিক প্রতিনিধি জানান, আগে মাসে হাতে গোনা কয়েকটি তালাকের আবেদন এলেও এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিভিন্ন কাজী অফিসে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী দম্পতিদের মধ্যেই বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি।

আড়াই বছরে ৬১ হাজার বিয়ে, তালাক ৩২ হাজারের বেশি

জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই বছরে বগুড়া জেলায় মোট ৬১ হাজার ৪০৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৩২ হাজার ২০৮টি। অর্থাৎ নিবন্ধিত বিয়ের প্রায় ৫২ দশমিক ৪৫ শতাংশের সমপরিমাণ বিচ্ছেদ ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩২টি তালাক নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে।

কিশোরী তালাকের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই

সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব নারীর বিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় হয়েছিল, তালাকের নথিতে তাদের বিয়ের সময়কার বয়স উল্লেখ থাকে না। ফলে বিভিন্ন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক জরিপে বাল্যবিয়ের তথ্য উঠে এলেও কিশোরী বয়সে বিবাহবিচ্ছেদের প্রকৃত পরিসংখ্যান আলাদাভাবে পাওয়া যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, ভুয়া জন্মনিবন্ধন বন্ধ, নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌতুকবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে কিশোরী তালাকের এই উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

জনপ্রিয়

বগুড়ায় প্রেস কাউন্সিলের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

বগুড়ায় প্রতিদিন বিয়ে রেজিষ্ট্রির অর্ধেকের বেশি হচ্ছে তালাক!

০৩:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

সোনাতলা সংবাদ ডেস্ক: মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সেবা (ছদ্মনাম)-এর। কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই সংসারজীবনে নেমে আসে নির্যাতনের অন্ধকার। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। এরই মধ্যে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। একসময় জীবন বাঁচাতে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে নানীর কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হন সেবা। দীর্ঘ কষ্টের পর পরিবারের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথই বেছে নিতে হয় তাকে।

সেবার মতো একই পরিণতি হয়েছে শাজাহানপুর উপজেলার রাবেয়া (ছদ্মনাম)-এর। কিশোরী বয়সেই একই গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু সংসার শুরুর পর থেকেই স্বামীর শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গত ২৪ জুন মাত্র ৮০ হাজার টাকা খোরপোশের বিনিময়ে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে।

একইভাবে গাবতলী উপজেলার টুম্পা (ছদ্মনাম)-এর সংসারও টেকেনি। বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া এই তরুণীকে গত ৩ জুলাই মাত্র ৫০ হাজার টাকা খোরপোশ দিয়ে তালাক দেন তার স্বামী। এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

বাল্যবিয়ে থেকে শুরু, শেষ হয় তালাকে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইনের বিধিনিষেধ এড়িয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে কিংবা কোনো নিবন্ধন ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার অভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্রুত মতবিরোধ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বামীর মাদকাসক্তি, জুয়া, পরকীয়া এবং যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের মতো নানা সামাজিক সমস্যা। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংসার ভেঙে যাচ্ছে।

শাজাহানপুর উপজেলায় বাল্যবিয়ে ও পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, উপজেলার একটি ইউনিয়নেই এক মাসে ৩১টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। তার মতে, অপরিণত বয়সে বিয়ে এবং রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ের কারণেই বিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তালাকের সময় নারীরা ন্যায্য খোরপোশও পান না। আবার কিছু তালাক মৌখিকভাবেও সম্পন্ন হচ্ছে।

গ্রামে বেশি ভাঙছে সংসার

নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারদী শবনম মিথুন বলেন, অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে দাম্পত্য জীবনে দ্রুত সংকট তৈরি হয়। গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা শহরের তুলনায় বেশি। অনেকেই আইনের চোখ ফাঁকি দিতে ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহার করে বা নিবন্ধন ছাড়া বিয়ে করেন। পাশাপাশি মাদক, যৌতুক, পরকীয়া এবং পারিবারিক সহিংসতা তালাকের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শহরের নারীরা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত, সচেতন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন। বর্তমানে তালাকের আবেদনগুলোর বড় অংশই আসছে নারীদের পক্ষ থেকে।

প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে তালাকের আবেদন

বগুড়া জেলা কাজী সমিতির একাধিক প্রতিনিধি জানান, আগে মাসে হাতে গোনা কয়েকটি তালাকের আবেদন এলেও এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিভিন্ন কাজী অফিসে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী দম্পতিদের মধ্যেই বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি।

আড়াই বছরে ৬১ হাজার বিয়ে, তালাক ৩২ হাজারের বেশি

জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই বছরে বগুড়া জেলায় মোট ৬১ হাজার ৪০৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৩২ হাজার ২০৮টি। অর্থাৎ নিবন্ধিত বিয়ের প্রায় ৫২ দশমিক ৪৫ শতাংশের সমপরিমাণ বিচ্ছেদ ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩২টি তালাক নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে।

কিশোরী তালাকের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই

সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব নারীর বিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় হয়েছিল, তালাকের নথিতে তাদের বিয়ের সময়কার বয়স উল্লেখ থাকে না। ফলে বিভিন্ন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক জরিপে বাল্যবিয়ের তথ্য উঠে এলেও কিশোরী বয়সে বিবাহবিচ্ছেদের প্রকৃত পরিসংখ্যান আলাদাভাবে পাওয়া যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, ভুয়া জন্মনিবন্ধন বন্ধ, নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌতুকবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে কিশোরী তালাকের এই উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।