কাহালু (বগুড়া) থেকেঃ বগুড়ার কাহালু উপজেলার শেখাহার গ্রামের মো. সিরাজুল হক মুন্টুর বেড়ে উঠা নিজ গ্রামেই। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভ্রমণ ও বইপ্রেমী। স্কুল-কলেজে পড়াশুনার সময় যখনই ছুটি পান তখনই কোথাও ভ্রমণে যান অথবা বই পড়ে সময় কাটান। ছাত্রজীবন থেকে চাকুরি জীবন এবং অবসর জীবনেও এভাবেই সময় কাটান এই ভ্রমণপিপাসু ও বইপ্রেমী।
ছাত্রজীবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচির বইয়ের পাশাপাশি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকের পান্ডুলিপিসহ তিনি বিভিন্ন বই পড়তেন সিরাজুল হক মুন্টু। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তার গ্রামের স্কুলেই। ছাত্রজীবনে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি রুটিনের বাইরে কোনো ভালো বই পেলে সেটি তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করতেন। তার এই আগ্রহের কখনোই পারিবারিকভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি বরং তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি বই কিনে নিজেও পড়তেন আবার অন্যকে বই পড়ার সুযোগ করে দিতেন। কোনো বই পড়া হয়ে গেলে যেখানে-যেখানে-সেখানে ফেলে রাখতেন না। পড়ার পর তিনি সব বইগুলোই যতœ করে রেখে দিতেন।
১৯৮০ সালে শেখাহার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৮২ সালে কাহালু ডিগ্রি কলেজ (বর্তমান কাহালু সরকারি কলেজ) থেকে তিনি এইচএসসি পাশ করেন। বই পড়ার নেশা থেকেই তিনি বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। বাংলা নিয়ে অনার্সে অধ্যায়ণরত অবস্থায় তার চাকুরি হয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে। চাকুরিতে যোগদানের ফলে ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। নানা কর্মব্যস্ততার পরেও তিনি বই পড়া ও নতুন নতুন বই সংগ্রহের ক্ষেত্রে ছাত্রজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেন। তিনি শুধু নিজেই বই পড়তেন না স্থানীয় স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ সব বয়সের মানুষকেই বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন।
তিনি চাকুরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীসহ সব বয়সি মানুষের জ্ঞানচর্চার জন্য ১৯৯৪ সালে শেখাহার বাজারে প্রতিষ্ঠা করেন “ড. মুসা পাঠাগার”। পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ অনেকে এখানে এসে কেউ বই পড়তেন আবার কেউ এখান থেকে বই সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়ে আবার ফেরত দিতেন। পর্ববর্তীতে আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বইপড়া থেকে মানুষ অনেকটা বিমুখ হলেও “ড. মুসা পাঠাগার” কতৃপক্ষ আপ্রাণ চেষ্ঠা করছেন; বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাতে অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে না গিয়ে বই পড়ে জ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হয়। সেই লক্ষ্য নিয়ে মো. সিরাজুল হক মুন্টু দেশি-বিদেশি অনেক ভালো লেখকের বই সংগ্রহ করে পাঠাগারে রাখেন সকলের পড়ার জন্য।
যারা সহজে শেখাহার বাজারে আসতে পারেন না তাদের কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে মো. সিরাজুল হক মুন্টু তার বাড়ির সাথেই পিতা-মাতার নামে “জাহানারা-আলতাফ গ্রন্থাগার” প্রতিষ্ঠা করেন। যাতে করে তার গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের লোকজন নিদ্রিষ্ট সময়ে এসে বই পড়তে পারেন এখানে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী থেকে পদন্নোতি পেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসাবে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের ১ জুন তিনি অবসর নেন। অবসর জীবনে তিনি “ড. মুসা পাঠাগার” ও “জাহানারা-আলতাফ গ্রন্থাগার” নিয়েই বেশি সময় কাটান। হাতে সময় থাকলে তিনি কবি-সাহিত্যিক ও গুণী মানুষের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে ভ্রমণে যান। সকলকে বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে ছুটির দিনে “জাহানারা-আলতাফ গ্রন্থাগার” এবং প্রায় প্রতিদিনই বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত “ড. মুসা পাঠাগারে” তিনি সময় দেন। এছাড়াও তিনি শেখাহার উচ্চ বিদ্যালয় ও শেখাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে মাঝে-মধ্যে শিক্ষার্থীদের ক্লাসও নেন। শেখাহার হাটের পূর্বপাশে অধ্যাপক ড. মোশারফ হোসেন খন্দকার মুসা এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও নিজের ব্যবহারের জন্য একটি ৭তলা ভূবন নির্মাণ করেছেন। সেই ভুবনের তৃতীয় তলায় একটি রুমে “ড. মুসা পাঠাগার” স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানেই উন্নত পরিবেশে অনেকেই বই পড়ছেন।
সম্প্রতি “ড. মুসা পাঠাগারে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থী ও কয়েকজন বয়স্কো মানুষ মনোযোগ সহকারে বই পড়ছেন। বয়স্কো মানুষদের মধ্যে চাকুরি শেষে কেউ অবসরপ্রাপ্ত আবার কেউ স্থানীয় গণ্যমান্য মানুষ। তারা জানান, বই পড়ে জ্ঞান অর্জন ও সময় কাটানোর জন্যই মাঝে-মধ্যে এই পাঠাগারে আসেন। মোছা. সিনথিয়া আফরিন শেখাহার উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী ও মিতালী আকতার শেখাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী। ছুটির দিন হওয়ায় তারা দুজনে এসেছে গল্পের বই পড়ার জন্য। তারা দুজনেই জানায়, বই পড়তে তাদের ভালো লাগে এজন্যই ছুটির দিন এখানে তারা বই পড়তে আসে।
মো. সিরাজুল হক মুন্টু জানান, দুটি পাঠাগার ও তার বাড়ি মিলে দেশি-বিদেশি লেখকের প্রায় ৬ হাজারের মতো বই রয়েছে। তিনি বই পড়ার পাশাপাশি তার লেখা তিনটি উপন্যাস (প্রকাশিত) এবং বেশ কিছু গান ও কয়েকটি গল্প অপ্রকাশিত রয়েছে। তার প্রকাশিত তিনটি উপন্যাসের নাম; তোমার অপেক্ষায় থাকবো, শেষ ঠিকানা ও খোলা আকাশের নীচে। আগামীদিনে তিনি ভ্রমণের পাশাপাশি ভালোমানের উপন্যাস লেখারও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ সংবাদ:-
কাহালুর ভ্রমণপিপাসু ও বইপ্রেমী সিরাজুল হক মুন্টু প্রতিষ্ঠা করেছেন দুটি পাঠাগার
-
Reporter Name - ০৩:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- ৫৩
Tag :
জনপ্রিয়



















