০৫:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের নিঝুম হত্যা মামলায় নাজিম কতি গ্রেফতার, ৫ দিনের রিমান্ড

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধিঃ বগুড়ায় ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তৃতীয় লিঙ্গের ফল ব্যবসায়ী ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম কতি (৩৭) হত্যা মামলায় নাজিম কতি নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হলে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ আগস্ট বগুড়া মহানগরের মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকার একটি ধানখেত থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি অর্ধগলিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে স্বজনরা মরদেহটি সুত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম কতি বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে ওয়াহেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তার পরিচিত নাজিম কতি ও মো. স্বপন। তদন্তের একপর্যায়ে প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে নিহতের যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে।

পুলিশ আরও জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিমের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, ওয়াহেদকে মালগ্রাম এলাকার একটি বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়ার পর তাকে কোমল পানীয়র সঙ্গে ক্ষতিকর দ্রব্য মিশিয়ে পান করানো হয়। পরে তার মৃত্যু হলে মরদেহ বস্তাবন্দী করে একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই সোহেল হোসেন বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে নাজিমের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে নাজিমকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওয়াহেদ কতি স্টেশন সড়কে তার বাবার সঙ্গে ফলের আড়ত পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে নাজিম কতি ও স্বপন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে পূর্বপরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে ওয়াহেদ তার মায়ের নামে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। পরে তিনি ওই অর্থ থেকে স্বপনকে দুই লাখ এবং নাজিমকে এক লাখ টাকা ধার দেন। ধার দেওয়া অর্থ ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ৭ আগস্ট ওয়াহেদকে মালগ্রাম এলাকার ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ক্ষতিকর দ্রব্য মেশানো পানীয় পান করানো হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। পরে তার মৃত্যু হলে মরদেহটি বস্তায় ভরে কাছাকাছি একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি।

পরদিন সকালে নাজিম ও স্বপন চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে ওয়াহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের মুঠোফোনের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করে নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নাজিমকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম জানান, নাজিমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপর অভিযুক্ত স্বপনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম হত্যাকাণ্ডের আগে ইন্টারনেটে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খোঁজার কথা জানিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত দ্রব্য, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং স্বপনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

জনপ্রিয়

বগুড়ায় প্রেস কাউন্সিলের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের নিঝুম হত্যা মামলায় নাজিম কতি গ্রেফতার, ৫ দিনের রিমান্ড

০২:২২:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধিঃ বগুড়ায় ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তৃতীয় লিঙ্গের ফল ব্যবসায়ী ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম কতি (৩৭) হত্যা মামলায় নাজিম কতি নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হলে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ আগস্ট বগুড়া মহানগরের মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকার একটি ধানখেত থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি অর্ধগলিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে স্বজনরা মরদেহটি সুত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম কতি বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে ওয়াহেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তার পরিচিত নাজিম কতি ও মো. স্বপন। তদন্তের একপর্যায়ে প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে নিহতের যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে।

পুলিশ আরও জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিমের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, ওয়াহেদকে মালগ্রাম এলাকার একটি বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়ার পর তাকে কোমল পানীয়র সঙ্গে ক্ষতিকর দ্রব্য মিশিয়ে পান করানো হয়। পরে তার মৃত্যু হলে মরদেহ বস্তাবন্দী করে একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই সোহেল হোসেন বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে নাজিমের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে নাজিমকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওয়াহেদ কতি স্টেশন সড়কে তার বাবার সঙ্গে ফলের আড়ত পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে নাজিম কতি ও স্বপন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে পূর্বপরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে ওয়াহেদ তার মায়ের নামে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। পরে তিনি ওই অর্থ থেকে স্বপনকে দুই লাখ এবং নাজিমকে এক লাখ টাকা ধার দেন। ধার দেওয়া অর্থ ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ৭ আগস্ট ওয়াহেদকে মালগ্রাম এলাকার ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ক্ষতিকর দ্রব্য মেশানো পানীয় পান করানো হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। পরে তার মৃত্যু হলে মরদেহটি বস্তায় ভরে কাছাকাছি একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি।

পরদিন সকালে নাজিম ও স্বপন চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে ওয়াহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের মুঠোফোনের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করে নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নাজিমকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম জানান, নাজিমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপর অভিযুক্ত স্বপনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম হত্যাকাণ্ডের আগে ইন্টারনেটে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম খোঁজার কথা জানিয়েছেন। হত্যায় ব্যবহৃত দ্রব্য, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং স্বপনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।