০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের রোডম্যাপ

তৃণমূল পুনর্গঠনে নজর, সরকার ও দলে ভারসাম্য খুঁজছে বিএনপি

বিশেষ প্রতিবেদনঃ জনগণকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নই এখন বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮০ দিনের একটি স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নতুন সরকার। ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানায়, পবিত্র রমজান মাসেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের আট বিভাগের আটটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। এর মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদানের একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় সরকার।

তবে কেবল সরকার পরিচালনাই নয়, সামনে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে দল। নির্বাচনে ধানের শীষ না পেয়ে বহু নেতা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন অনেক জায়গায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দল এখন তৃণমূল গুছিয়ে সুসংগঠিত অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। ঈদুল ফিতরের পর পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত নেতাদের বিষয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না দল।

বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যুতে অনুসন্ধান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির নেতারা দলীয় প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়েন। যদিও শেষ পর্যন্ত এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, তবু এত সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দল।

দলীয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—বিদ্রোহীরা ২০টির মতো আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে সুবিধা পাইয়ে দেন, ৭টিতে নিজেরাই জয়ী হন। সব মিলিয়ে ২৭টির মতো আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে দল জানতে চায়, বিদ্রোহী হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাকি অন্য কোনো ইন্ধন কাজ করেছে। একই সঙ্গে যেসব প্রার্থী জয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরাজিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও কারণ অনুসন্ধান শুরু হবে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

সরকার গঠন ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ

নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পাদকদের কয়েকজনও মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে শূন্যতা তৈরি হতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে দলীয় অঙ্গনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ দল পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের জায়গায় দ্রুত কর্মঠ ও সময় দিতে সক্ষম নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

দলীয় সূত্র জানায়, নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত রয়েছে—যারা সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন, তাদের পরিবর্তে অন্যদের সাংগঠনিক দায়িত্বে আনা হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

রমজানকেন্দ্রিক কর্মসূচি

পবিত্র রমজান উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে সীমিত পরিসরে ইফতার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও এমপি ও দলীয় নেতারা ইফতার মাহফিল করবেন।

এ ছাড়া ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল বস্তি ও ভাসানটেক এলাকার ১৪টি এতিমখানা ও হেফজ মাদ্রাসায় পুরো রমজান মাসজুড়ে ইফতার, সেহরি ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম রোজায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা।

দল-সরকার ভারসাম্যের প্রশ্ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও দলের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারে থাকা নেতাদের দলীয় জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং দলকে সরকারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে আলাদা রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই সাফল্য আসবে।

তাদের মতে, সরকারে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের সম্পূর্ণভাবে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি দল-সরকার একাকার হয়ে যাওয়াও উচিত নয়। কার্যকর যোগাযোগ ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করতে পারলেই সরকার ও দল—উভয়ের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং দলীয় পুনর্গঠন কতটা কার্যকর হয়—এ দুই দিকেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি।

Write Your Comment

About Author Information

জনপ্রিয়

বগুড়ায় প্রেস কাউন্সিলের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের রোডম্যাপ

তৃণমূল পুনর্গঠনে নজর, সরকার ও দলে ভারসাম্য খুঁজছে বিএনপি

০৩:৪২:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদনঃ জনগণকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নই এখন বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮০ দিনের একটি স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নতুন সরকার। ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানায়, পবিত্র রমজান মাসেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের আট বিভাগের আটটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হবে। এর মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদানের একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় সরকার।

তবে কেবল সরকার পরিচালনাই নয়, সামনে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে দল। নির্বাচনে ধানের শীষ না পেয়ে বহু নেতা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন অনেক জায়গায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দল এখন তৃণমূল গুছিয়ে সুসংগঠিত অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। ঈদুল ফিতরের পর পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত নেতাদের বিষয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না দল।

বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যুতে অনুসন্ধান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির নেতারা দলীয় প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়েন। যদিও শেষ পর্যন্ত এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, তবু এত সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দল।

দলীয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—বিদ্রোহীরা ২০টির মতো আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে সুবিধা পাইয়ে দেন, ৭টিতে নিজেরাই জয়ী হন। সব মিলিয়ে ২৭টির মতো আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে দল জানতে চায়, বিদ্রোহী হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাকি অন্য কোনো ইন্ধন কাজ করেছে। একই সঙ্গে যেসব প্রার্থী জয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরাজিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও কারণ অনুসন্ধান শুরু হবে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের মাধ্যমে এ বিষয়ে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

সরকার গঠন ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ

নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পাদকদের কয়েকজনও মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে শূন্যতা তৈরি হতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে দলীয় অঙ্গনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ দল পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের জায়গায় দ্রুত কর্মঠ ও সময় দিতে সক্ষম নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

দলীয় সূত্র জানায়, নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত রয়েছে—যারা সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন, তাদের পরিবর্তে অন্যদের সাংগঠনিক দায়িত্বে আনা হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

রমজানকেন্দ্রিক কর্মসূচি

পবিত্র রমজান উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে সীমিত পরিসরে ইফতার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও এমপি ও দলীয় নেতারা ইফতার মাহফিল করবেন।

এ ছাড়া ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল বস্তি ও ভাসানটেক এলাকার ১৪টি এতিমখানা ও হেফজ মাদ্রাসায় পুরো রমজান মাসজুড়ে ইফতার, সেহরি ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম রোজায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা।

দল-সরকার ভারসাম্যের প্রশ্ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও দলের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারে থাকা নেতাদের দলীয় জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং দলকে সরকারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থেকে আলাদা রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই সাফল্য আসবে।

তাদের মতে, সরকারে দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের সম্পূর্ণভাবে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি দল-সরকার একাকার হয়ে যাওয়াও উচিত নয়। কার্যকর যোগাযোগ ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করতে পারলেই সরকার ও দল—উভয়ের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং দলীয় পুনর্গঠন কতটা কার্যকর হয়—এ দুই দিকেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি।