কাহালু (বগুড়া): বগুড়ার কাহালু উপজেলা সদরে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পাঁচতলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামে সজ্জিত হলেও জনবল সংকটে সেখানে এখনো শুরু হয়নি স্থায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। ফলে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধা জেলার তাঁতীরা আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তাঁতবস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে তাঁতশিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আশির দশকে বগুড়ার কাহালু উপজেলা সদরে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টার স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও গাইবান্ধা জেলার তাঁতীদের সংগঠিত করতে বিভিন্ন এলাকায় তাঁতী সমিতি গঠন করা হয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, ঋণ সহায়তা ও বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এসব কার্যক্রমের ফলে নব্বইয়ের দশকে ওই চার জেলায় তাঁতশিল্পের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটে। তাঁতীরা নিজ নিজ বাড়িতে তাঁত বসিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, চাদর, গামছাসহ বিভিন্ন ধরনের তাঁতবস্ত্র উৎপাদন করতেন। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার শাওলসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে তাঁতবস্ত্রের বড় বাজার। এসব বাজার থেকে বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে তাঁতবস্ত্র কিনে নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে বিক্রি করতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে বাজারের চাহিদা পরিবর্তিত হলেও প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রশিক্ষণ না থাকায় পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন এ অঞ্চলের তাঁতীরা। স্থানীয় তাঁতীদের ভাষ্য, তারা মূলত পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা কৌশলে ২০/৩২ সাইজের মোটা সুতো দিয়ে তাঁতবস্ত্র তৈরি করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী চিকন সুতো ও আধুনিক নকশার তাঁতবস্ত্র উৎপাদনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনেকেরই নেই।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা আধুনিক প্রশিক্ষণ নিয়ে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উন্নতমানের তাঁতবস্ত্র তৈরি করছেন। ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের অনেক তাঁতী। ক্রেতা ও বাজার কমে যাওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।
কাহালু উপজেলার কালাই কর্ণিপাড়া (পূর্ব) গ্রামের চিত্রও একই। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের প্রায় সব পরিবারই তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। তিন শতাধিক তাঁতীর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৫ জনের মতো তাঁতী তাঁত চালু রেখেছেন।
গ্রামের তাঁতী হযরত আলী বলেন, তাঁর বাড়িতে এখনো তাঁত রয়েছে। কিন্তু আগের মতো কাজ ও আয় না থাকায় তিনি তাঁতের কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁর মতো অনেকেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বাজারের অভাবে তাঁতশিল্প ছেড়ে দিয়েছেন।
কালাই ইউনিয়ন তাঁতী সমিতির সাবেক সভাপতি বেলার হোসেন বলেন, একসময় এ অঞ্চলে তাঁতবস্ত্রের জমজমাট বাজার ছিল। তাঁতীরা এই পেশার মাধ্যমে স্বচ্ছন্দে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাবে বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে না পারায় বর্তমানে টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা বাজারে এগিয়ে গেছেন। কাহালুতে নির্মিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালু হলে এ অঞ্চলের তাঁতশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চার জেলার তাঁতীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে কাহালু বেসিক সেন্টারের পাশে পাঁচতলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ শেষে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সীমানাপ্রাচীরের কাজ বাদে পাঁচতলা ভবনটি বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে তাঁতবস্ত্র তৈরি ও প্রশিক্ষণের জন্য অ্যানালগ ও ডিজিটাল সেলাই মেশিন, ডিজিটাল পাওয়ার লুম, তাঁত, এমব্রয়ডারি, চরকাসহ প্রায় ২০টি মূল্যবান মেশিন ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকলেও এখনো প্রশিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ভবন হস্তান্তরের পর রংপুর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষকরা এসে দুই ব্যাচে ২০ জন করে মোট ৪০ জন তাঁতীকে বিভিন্ন ট্রেডে সাত দিন করে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তবে এরপর থেকে স্থায়ীভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়নি।
গত ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন, সদস্য ড. মোহাম্মদ মুঞ্জুরুল ইসলাম এবং পরিচালক (প্রশাসন) উপসচিব কে এম আবুল কালাম কাহালু তাঁত বোর্ডের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বেসিক সেন্টার পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন এলাকার তাঁতী সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য কবে প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হবে এবং নিয়মিত কার্যক্রম কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
কাহালু তাঁত বোর্ডের বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা তন্ময় কুমার বলেন, বেসিক সেন্টারের কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। তবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য এখনো প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হয়নি। জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে সেখানে স্থায়ীভাবে তাঁতবস্ত্র উৎপাদন ও তাঁতীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় তাঁতীদের দাবি, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে চালু করা হলে তাঁতীরা যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ পাওয়ার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
মুনসুর রহমান তানসেন 














