সোনাতলা সংবাদ ডেস্ক: নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, দিগন্তজুড়ে সবুজ চর আর তার বুকে সাদা কাশফুলের অপূর্ব সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকে কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে সাদা চাদর। বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। শরতের এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে বগুড়ার সারিয়াকান্দির বিভিন্ন চরাঞ্চলে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে নৌকার মাঝি ও স্থানীয় খাবারের দোকানিদের আয়। অন্যদিকে, বিনা খরচে জন্মানো কাশগাছ বিক্রি করে বাড়তি আয়ের স্বপ্ন দেখছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা।
উপজেলার কাজলা, চালুয়াবাড়ী, কর্ণিবাড়ী ও বোহাইল ইউনিয়নের প্রায় পুরো এলাকা এবং হাটশেরপুর, সারিয়াকান্দি সদর, চন্দনবাইশা, কুতুবপুর ও কামালপুর ইউনিয়নের আংশিক এলাকাজুড়ে থাকা শতাধিক চরে ফুটেছে কাশফুল। বছরের এই সময়ে চরাঞ্চলগুলো পরিণত হয় প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যকেন্দ্রে।
কাশবনে পর্যটকের ভিড়, মুগ্ধ প্রকৃতিপ্রেমীরা
সারিয়াকান্দি পৌর এলাকার কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ প্রতিবছরই পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। বিশেষ করে কাশফুল ফোটার মৌসুমে এখানে দর্শনার্থীদের আগমন বেড়ে যায়। ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাশবনে ঘুরতে আসছেন অনেকে।
কালিতলা নৌঘাট থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় নৌকায় চড়ে বিভিন্ন চরের কাশবাগানে পৌঁছাচ্ছেন পর্যটকেরা। কাশফুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি উপভোগ করছেন যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি ও চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ।
কাশবনে পৌঁছে কেউ তুলছেন সেলফি, কেউ ব্যস্ত দলবদ্ধ ছবি তুলতে। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন আনন্দঘন সময়। কেউ কেউ স্মৃতি হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন একগুচ্ছ কাশফুল। বাতাসে কাশফুলের তুলার মতো অংশ উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য প্রকৃতির সৌন্দর্যে যোগ করছে ভিন্নমাত্রা।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কাশবনের সৌন্দর্যের কথা জেনে পরিবার ও পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে তিনি সারিয়াকান্দিতে এসেছেন। নৌকায় জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে কাশবাগানে পৌঁছে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, “যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু কাশফুল আর কাশফুল। কাশফুলের সঙ্গে অনেক ছবি তুলেছি। বাড়িতে নেওয়ার জন্যও কিছু কাশফুল সংগ্রহ করেছি।”
পর্যটক বাড়ায় মাঝিদের আয় তিন গুণ
কাশফুল দেখতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ায় কালিতলা নৌঘাটের মাঝিদের আয়ও বেড়েছে। আগে যেখানে দৈনিক এক হাজার টাকাও আয় করা কঠিন ছিল, সেখানে এখন ছুটির দিনে তিন হাজার টাকার বেশি আয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৌকার মাঝি আমিরুল ইসলাম বলেন, কাশবনে পর্যটক আসায় তাঁদের আয় বেড়েছে। আগে দৈনিক এক হাজার টাকা আয় করাও কঠিন ছিল। এখন ছুটির দিনে তিন হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারছেন।
শুধু নৌকার মাঝিরাই নন, কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধের বিভিন্ন খাবারের দোকানিরাও পর্যটক বাড়ায় লাভবান হচ্ছেন। দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরোচক খাবার ও বিভিন্ন ধরনের নাশতার দোকানে আগের তুলনায় বেচাকেনা বেড়েছে।
বিনা খরচে জন্মানো কাশগাছেই কৃষকের বাড়তি আয়
কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কাশগাছ। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এসব গাছ উৎপাদনে কৃষকদের বীজ বপন, সার প্রয়োগ কিংবা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ফলে কাশগাছ বিক্রি করে তাঁদের বাড়তি আয় করার সুযোগ তৈরি হয়।
চরাঞ্চলের কৃষকেরা প্রতিবছর কাশগাছ বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার পানের বরজে কাশগাছ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রয়োজনেও এসব গাছ কাজে লাগে। গাছ কাটার পর নিচের শক্ত অংশ ও গোড়া জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে কাশগাছের বিভিন্ন অংশই মানুষের কাজে আসে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় পুলিশের সতর্কতা
কাশফুল দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে পুলিশ। সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ কাশবাগান থাকায় কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ এলাকায় পর্যটকদের চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের দল বিশেষভাবে কাজ করছে।
তিনি পর্যটকদের মাগরিবের নামাজের আগেই কাশবাগান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি সাঁতার না জানা ব্যক্তিদের নৌকায় চলাচল ও পানিতে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার এবং কাশবনের গভীরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, যমুনার ঢেউ আর দিগন্তজোড়া সাদা কাশফুল—সব মিলিয়ে সারিয়াকান্দির চরাঞ্চল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ঘিরে যেমন মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি স্থানীয় মাঝি, দোকানি ও কৃষকদের জন্যও খুলেছে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা।
Reporter Name 


















